এক মাসের ব্যবধানে একের পর এক হত্যাকাণ্ড। প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মহড়া,
দিনদুপুরে গুলি, কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষ, মাদক নিয়ে বিরোধে খুন- এসব
ঘটনায় নোয়াখালীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা
দিয়েছে।
বাসিন্দারা বলছেন, সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে। কিশোর গ্যাং ও মাদকসেবীদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন তারা।
গত
১০ জুন সেনবাগ উপজেলায় মাদকসেবনে বাধা দেওয়া কেন্দ্র করে কুপিয়ে হত্যা
করা হয় এসএসসি পরীক্ষার্থী আরাফাত হোসেন ফাহিমকে। এর এক দিন আগে বেগমগঞ্জ
উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নে প্রকাশ্যে ফারুক হোসেন নামে এক যুবককে লক্ষ্য করে
এলোপাতাড়ি গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। ওই ঘটনার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এর আগে ৩০
মে রাতে বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাশপুর এলাকায় কিশোরদের বিরোধে ফরহাদ নামে এক
কিশোরকে রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হন তার চাচা কামাল উদ্দিন। একই রাতে
বেগমগঞ্জ উপজেলার শরীফপুরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন জোবায়ের হোসেন
রাকিব। পরে ওই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে অভিযুক্তদের বাড়িতে ভাঙচুর ও
অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
গত ৪ এপ্রিল সদর উপজেলার
দাদপুর এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় সেলিম নামে এক ব্যবসায়ী নিহত হন।
সম্প্রতি কবিরহাটে গণপিটুনিতে এক ব্যক্তি এবং সদর উপজেলায় জমিসংক্রান্ত
বিরোধে এক বৃদ্ধ নিহত হওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে।
স্থানীয়দের
অভিযোগ, জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র অনুযায়ী,
নোয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার উদ্বেগজনক। জেলা শহর ও
উপজেলার বিভিন্ন সড়ক, দেয়াল ও ভবনে বিভিন্ন গ্যাংয়ের নাম লেখা দেখা
যায়। এর মধ্যে এনটিএস, বিটিআর, কেটিজি, এসআরজি-টু জিরো, এনবিজি-সেভেনটি,
এম-সিক্সটি নাইন, ডিএমজি, বোম-ই-ফোরএস এবং থ্রি এইট জিরো জিরো উল্লেখযোগ্য।
স্থানীয়
বাসিন্দাদের দাবি, জেলাজুড়ে এমন দুই শতাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে।
এসব গোষ্ঠীর সদস্যরা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। অনেক
সময় তাদের হাতে দেশীয় অস্ত্রও দেখা যায়। বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার হলেও
প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তারা পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে বলে
অভিযোগ।আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পেছনে মাদককে অন্যতম কারণ হিসেবে
দেখছেন স্থানীয়রা।
তাদের অভিযোগ, জেলা শহরের
হরিনারায়ণপুর বাজার, মুসলিম কলোনি, লক্ষ্মীনারায়ণপুর, রাজারামপুর, মাইজদী
বাজার ও বিভিন্ন রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা হয়।
নোয়াখালী
পৌরসভার হাউজিংয়ের বাসিন্দা আকরাম হোসেন হৃদয় বলেন, প্রায় প্রতিদিন রাতে
আমাদের এলাকার খালি জায়গাগুলোতে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। বাধা দিলে উল্টো
হুমকি দেয়। পরিবার নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হয়।
জেলা
শহর মাইজদীর একাধিক ব্যবসায়ী ও বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাত
বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু টং দোকান, চিপাগলি ও নির্জন স্থানে সন্দেহভাজন
ব্যক্তিদের আনাগোনা বেড়ে যায়। ওখান থেকে শুরু হয় মাদক বেচাকেনা ও
ছিনতাই’সহ নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ড। সৃষ্টি হয় সংঘাত ও খুনের মতো ঘটনা।
সদর
উপজেলার মান্নান নগর এলাকার একাধিক বাসিন্দা বলেন, এই অঞ্চলের মাদক ব্যবসা
নিয়ন্ত্রণ হয় বেদে পল্লী থেকে। এখানকার মাদক ব্যবসায়ীরা বেদে পল্লীকে
তাদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেচে নিয়েছেন। এই মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে গড়ে
ওঠেছে একাদিক কিশোর গ্যাং গ্রুপ। কিশোর গ্যাং গ্রুপগুলোর মাধ্যমে মান্নান
নগর, খলিল মিয়ার দরজা, মান্নান হাইস্কুল, হানিফ চেয়ারম্যান বাজার, করমূল্যা
বাজার, সাহেবের হাট, মমিন নগর, মেম স্কুল, কালা হুজুরের দোকান’সহ আশপাশের
এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে মাদক।
অনেকের অভিযোগ, রাত ১০টার
পর অনেক এলাকায় পুলিশের দৃশ্যমান টহল চোখে পড়ে না। স্থানীয়দের মতে,
হত্যাকাণ্ড, মাদক, কিশোর গ্যাং, রাজনৈতিক বিরোধ এবং জমিসংক্রান্ত সংঘাত
মিলিয়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় অস্থিরতা বাড়ছে। তারা গোয়েন্দা নজরদারি
বৃদ্ধি, বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার, অপরাধপ্রবণ এলাকায় সিসি
ক্যামেরা স্থাপন এবং আলোচিত মামলাগুলোর দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
নোয়াখালীর
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন বলেন,
জেলার বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ নিয়মিত টহল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিশোর
গ্যাং প্রতিরোধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা
অভিযোগ না করায় কিছু অপরাধের তথ্য পুলিশের কাছে আসে না। অভিযোগ পেলে আইনগত
ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।