

১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সময় যত ঘনিয়ে আসছে, জনমনে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশজুড়ে নির্বাচনি সহিংসতার কারণে রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। দিন যত যাচ্ছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও দৃশ্যমান হচ্ছে।
সরকারি তথ্যে বলা হয়েছে, নির্বাচনি প্রচার শুরু হওয়ার পর ২১ জানুয়ারি থেকে চারজন নিহত এবং আহত হয়েছেন ৪১৪ জন । এ সময় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৫১টি।
সংঘর্ষে নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার এরশাদ বাজারে স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের সমর্থক নজরুল ইসলাম, শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি রেজাউল করিম, কিশোরগঞ্জ-২ কটিয়াদি উপজেলার বিএনপির সাবেক সভাপতি ও ইউপি সদস্য মো. কামাল উদ্দিন, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কাঞ্চনে আজাহর।
রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি ছিনতাই ও সাধারণ অপরাধের ঘটনায় শঙ্কা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নির্জন ও ব্যস্ত সড়কেও মানুষ নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছেন। ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ বিশেষ করে সন্ধ্যার পর নিরাপত্তা ঝুঁকি বেশি মনে করছেন। বিভিন্ন দেশের দূতাবাসও নাগরিকদের সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের অনুরোধ জানিয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ১১ ডিসেম্বর তপশিল ঘোষণার পর ১২ ডিসেম্বর থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে ১৪৪টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৫৫টি সংঘর্ষ, ১১টি ভীতি প্রদর্শন ও আক্রমণাত্মক আচরণ, ৬টি প্রার্থীর ওপর হামলা, ২টি অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার, ১৭টি প্রচার কাজে বাধা, ৮টি নির্বাচনি অফিসে হামলা ও অগ্নিসংযোগ এবং ২৪টি অন্যান্য ঘটনা অন্তর্ভুক্ত।
পুলিশের তথ্যে আরও জানা যায়, দেশের ১৩টি আসন অতি ঝুঁকিপূর্ণ। এ আসনগুলো হলো- পাবনা-১ ও ৩। এ ছাড়া খুলনা-৫, পটুয়াখালী-৩, বরিশাল-৫, টাঙ্গাইল-৪, শেরপুর-৩, ঢাকা-৮, ঢাকা-১৫, ঢাকা-৭, কুমিল্লা-৪, নোয়াখালী-৬ ও চট্টগ্রাম-১৫। পুলিশের তালিকায় অতি ঝুঁকিপূর্ণ এসব আসনের কয়েকটিতে এরই মধ্যে একাধিক দফা নির্বাচনি সংঘাত হয়েছে।
এ ছাড়াও মধ্যম ঝুঁকিতে থাকা জেলাগুলো হলো- ‘পঞ্চগড়-১, ঠাকুরগাঁও-১, ঠাকুরগাঁও-৩, লালমনিরহাট-১, রংপুর-৩, রংপুর-৪, গাইবান্ধা-৫, বগুড়া-২, বগুড়া-৪, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩, রাজশাহী-১, রাজশাহী-২, নাটোর-১, সিরাজগঞ্জ-৪, কুষ্টিয়া-১, কুষ্টিয়া-৩, চুয়াডাঙ্গা-১, ঝিনাইদহ-৩, ঝিনাইদহ-৪, যশোর-২, খুলনা-৪, সাতক্ষীরা-১, বরগুনা-২, পটুয়াখালী-২, ভোলা-১, বরিশাল-৩, পিরোজপুর-২, টাঙ্গাইল-৮, ময়মনসিংহ-১০, ময়মনসিংহ-১১, নেত্রকোনা-৩, কিশোরগঞ্জ-৫, মানিকগঞ্জ-১, মুন্সীগঞ্জ-৩, ঢাকা-৭, ঢাকা-১০, নারায়ণগঞ্জ-৩, ফরিদপুর-৪, সুনামগঞ্জ-২, মৌলভীবাজার-৩, কুমিল্লা-১১, চাঁদপুর-৪, নোয়াখালী-২, চট্টগ্রাম-১৪ ও চট্টগ্রাম-১৬।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে সহিংসতা আরও বেড়েছে। ৬৪টি নির্বাচনি সহিংসতার মধ্যে ৩৩টি সংঘর্ষ বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে, ১৩টি বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্ব, ৯টি বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে এবং বাকিগুলো অন্যান্য পার্টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে সংঘর্ষ ঘটেছে।
আইন ও সালিশকেন্দ্র জানায়, জানুয়ারি মাসে কমপক্ষে ৭৫টি সংঘর্ষে ১১ জন নিহত এবং ৬১৬ জন আহত হয়েছেন। নির্বাচনি প্রচার শুরু হওয়ার পর ২১ থেকে ৩১ জানুয়ারি কমপক্ষে ৫১টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
আর ডিসেম্বর মাসে সারা দেশে সাতটি সহিংসতায় একজনের প্রাণহানির পাশাপাশি ২৭ জন আহত হয়েছেন। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৫১টি আসনে নির্বাচনি সংঘর্ষ হয়েছে। এসব আসন হলো- পঞ্চগড়-১, লালমনিরহাট-১, চুয়াডাঙ্গা-১, বরগুনা-২, পটুয়াখালী-৩, ভোলা-১, বরিশাল-৩, টাঙ্গাইল-৮, শেরপুর-৩, নেত্রকোনা-৩, মানিকগঞ্জ-১, মুন্সীগঞ্জ-৩, ঢাকা-৮, ঢাকা-১৫, কুমিল্লা-১১, যশোর-৫, কুমিল্লা-৯, বাগেরহাট-১, খুলনা-৩, শরীয়তপুর-১, সিরাজগঞ্জ-১, ঢাকা-১২, ভোলা-৩, চট্টগ্রাম-২, ফেনী-৩, ফেনী-১, নারায়ণগঞ্জ-৪, লক্ষ্মীপুর-৩, ময়মনসিংহ-১, বগুড়া-৫, কিশোরগঞ্জ-৪, চট্টগ্রাম-১১, বরিশাল-১, মাদারীপুর-৩, ভোলা-২, ময়মনসিংহ-৯, লক্ষ্মীপুর-২, টাঙ্গাইল-১, খুলনা-২, সিরাজগঞ্জ-২, জামালপুর-৪, শরীয়পুর-২, নারায়ণগঞ্জ-২, ঢাকা-৩, ঝালকাঠি-১, চট্টগ্রাম-১, পিরোজপুর-৩, ময়মনসিংহ-২, ঢাকা-৪ ও ভোলা-৪।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সুষ্ঠু ভোট সম্পন্ন করতে পুলিশ সার্বক্ষণিক সতর্ক। ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে বডিওর্ন ক্যামেরাসহ পুলিশ মোতায়েন থাকবে। দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, নির্বাচনি সহিংসতার মূল কারণ হলো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আধিপত্য বিস্তার এবং প্রার্থীদের মধ্যে মূল্যবোধের অভাব। তিনি বলেন, সংঘাতপ্রবণ এলাকায় সমানভাবে আইন প্রয়োগ না করলে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে।